বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৪:৫১ অপরাহ্ন

চলনবিলে শুটকি মাছের মহাৎসব নারী শ্রমিক শুটকি মাছ বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন

রফিকুল ইসলাম সজীব, স্টাফ রিপোর্টারঃ
  • আপডেট টাইম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দেশের বৃহত্তর জলাভূমি চলনবিলে এখন থইথই পানি নেই, চলনবিলে শুটকি মাছ তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উজেলার মহিষলুটি মাছের আড়তে শুটকি মাছ শুকানোর ধুম চলছে।

এ জনপদের তিনটি জেলার ৯ উপজেলার নারী শ্রমিক তাদের ব্যস্ত সময় পার করছে। নারীদের হাতের জাদুর তৈরি চলনবিলের শুঁটকি এখন দেশ ছেড়ে বিদেশে। শুটকি তৈরিতে নারীদের অবদানের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই শুটকি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব এবং সময় থাকতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জরুরিভাবে গ্রহণ করা দরকার বলে মনে করছেন শুটকি চাতাল মালিকরা।
উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া ও রাজশাহী অঞ্চলে দেশীয় পদ্ধতিতে শুটকি তৈরি করা হচ্ছে। সেই ভোরের আলো ফোটা থেকে শুরু হয় নারী শ্রমীকদের কর্মযজ্ঞ। মাছে লবণ মাখানো, মাপজোখ করা, বহন করে মাচায় নেওয়া, শুটকি উল্টে-পাল্টে নাড়া, শুটকি বাছাই করা – আরও কত কাজ! আর এসব কাজই হয় নারীর হাতে।
এসব চাতালে শোল, বোয়াল, পুঁটি, খলশে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, বাইমসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। মহাজন কেবল মাছ কিনেই দায়মুক্ত। তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়ত, চাটমোহর উপজেলার বোয়ালমারি, সিংড়া বাজার সহ বিভিন্ন আড়ত থেকে মাছ ক্রয় করে মহাজনরা। চলনবিলের মিষ্টি পানির মাছের শুটকির জন্য বেশ নাম আছে জায়গা গুলোর। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাটিকুমরুল-বোনপাড়া হাইওয়ে রোড় সংলগ্ন রাস্তার পাশের বিশাল এলাকাজুড়ে বিভিন্ন স্থানে বসে শুটকি মাছ তৈরির চাতাল। আশপাশের গ্রামের নারীর প্রাণ এ শুটকি পল্লী। চলনবিলের অধিকাংশ মাছ চলে আসে জেলা-উপজেলা সদরের আড়ত ও বাজারে। সেখান থেকে পাইকাররা শুটকির জন্য কিনে আনেন শত শত মণ মাছ।
এখন সেপ্টেম্বর মাস বিল থেকে পানি নামতে শুরু করছে, মাছের ভরা মৌসুম। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্ব মাস পর্যন্ত চলে শুটকির মাছ সংগ্রহ। বর্ষার পানিতে চলনবিলাঞ্চলে যেসব মাছ বেড়ে ওঠে, সেসব মাছ ধরা চলে এসময় পর্যন্ত। চলনবিলাঞ্চলে বিভিন্ন শুটকি চাতালে এ মৌসুমে প্রতিদিন শুটকি মাছ দাঁড়ায় ৫০-৬০ মণ। জানালেন শুটকি চাতাল মালিকদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম, আবুল কাশেম ও আরিফুল ইসলাম। সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানা জায়গা লিজ নিয়ে চালানো চলনবিলাঞ্চে বিভিন্ন শুটকি পল্লীতে এখন কাজ করছেন তিনশত থেকে চারশত নারী।
মাছ মাপজোখের পর মাখানো হয় লবণ। লবন মাখানো মাছ দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে, এছাড়া মাছ ভালোও রাখে। লবণ মাখানো হলেই কাঁখে করে নারীরা নিয়ে যান মাচায়। মাচায় নেওয়ার পর মাছগুলো সুন্দর করে বিছিয়ে রোদমুখী করা হয়। এ কাজটিও করেন নারীরাই। শুধু রোদে দেওয়া নয়, সারাদিন তাদের কাজ কয়েকবার উল্টে-পাল্টে দেওয়া। রোদ কম থাকলে শুকাতে লাগে তিন-চার দিন। আবার রোদ বেশি থাকলে একদিনেই শুটকি হয়ে যায়। তবে বড় কিছু মাছে আবার একটু সময় বেশি লাগে। শুটকি আকারভেদে দাম হয় ভিন্ন ভিন্ন। ছোট আকারের মাছের শুঁটকি প্রতিমণ ১৬ থেকে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বড় আকৃতির মাছের শুটকি ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা মণ।
মহাজন নিয়মিত শ্রমিকদের খেতে দেন, তাতে কম মজুরিতে কাজ করেও খুশি নারী শ্রমীকরা। প্রতিদিন একজন নারী শ্রমীক কে মুজুরি দেওয়া হয় ৩০০ টাকা, পুরুষ শ্রমীকদের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা। গ্রামের সরল এসব নারী অল্পতেই তুষ্ট। তাই সারাদিন বিরামহীন খেটেও মুখে কষ্টের কথা নেই। মহাজনরা সবসময় ভালোই থাকেন। তবে এই নারীরাই দৃঢ় কর্মদক্ষতায় তাদের ভালো রাখেন।
সাপ্তাহিক চলনবিলের আলো সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রনি এ বিষয়ে বলেন, বৃত্তর চলনবিল অঞ্চল শস্য ও মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত এই অঞ্চলের ফসলাদি ও মৎস্য সুস্থভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ব্যাপক উন্নতি লাভ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা মৎস্য অফিসার মশগুল আজাদ বলেন, চলনবিলের শুটকির সুনাম ও চাহিদা দুটোই রয়েছে। ফলে আমরা এই শুটকির মান বৃদ্ধির জন্য চাতাল মালিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। চাতাল মালিকরা অস্থায়ী হওয়ায় তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না তবে এ বিষয়ে আমরা বিবেচনা করছি। আশা করি, এই অঞ্চলের শুটকি ব্যবসা আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © Matrijagat TV
Developed BY Matrijagat TV
matv2425802581