শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৯ অপরাহ্ন

বিচারক হওয়ার আইনি লড়াইয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুদীপ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৯

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুদীপ চন্দ্র দাস ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার ছেলে। লেখাপড়া করেছেন আইন বিষয়ে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে কাজ করার ইচ্ছা নিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার দৃঢ় সংকল্প তিনি দৃষ্টিহীন হলেও সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে চান। এজন্য শ্রুতিলেখকের সহায়তা চান তিনি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে বিচারক হিসেবে কাজ করার প্রচণ্ড আগ্রহ রয়েছে। তিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও জেলা জজ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

সুদীপ চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়, আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী ও সনদদানকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলসহ অন্যান্য সব পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক রাখার নিয়ম থাকলেও সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় কেন থাকবে না?’

তিনি বলেন, ‘বিসিএস পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা আছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) যদি শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা থাকে তবে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে কেন থাকবে না। আমার জন্য না হোক, অন্ততপক্ষে আমার অনুজ অন্যদের জন্য যাতে এ ব্যবস্থাটা চালু করা করা যায়, সে বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা আসুক, তাই রিট করেছি।’

নিম্ন আদালতে সহকারী জজ নিয়োগে ত্রয়োদশ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ৮ নভেম্বর (শুক্রবার) অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শ্রুতিলেখক দেয়ার জন্য নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। জনস্বার্থে বুধবার (৬ নভেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুদীপ চন্দ্র দাস নামের এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই রিট আবেদন করেন।

তিনি বিচারক পদে প্রার্থী হয়ে পরীক্ষায় আবেদন করার সময় তাকে জানানো হয়, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে বিচারক নিয়োগ বিধিতে রয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাউকে শ্রুতিলেখক দেয়ার নিয়ম নেই। ফলে আইন বিষয়ে পড়ালেখা শেষে ইচ্ছা থাকলেও অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। যদিও ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিচারকরা দায়িত্ব পালন করছেন। তাই তিনি বলেছেন, রিটের মাধ্যমে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।

জন্ম থেকেই এক চোখে দেখেন না সুদীপ। আরেকটি চোখও ধীরে ধীরে নষ্ট হতে চলছে। কিন্তু দমবার পাত্র নন তিনি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক করেছেন। এবার সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদনও করেছেন। কিন্তু প্রতিবন্ধী বলে তাকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিচ্ছে না বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএসসি)।

সুদীপের বাবা প্রদীপ চন্দ্র দাস রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মা মিরা দাস সরকারি একটি স্কুলের শিক্ষক। তিন ভাইবোনের মধ্যে সুদীপ দ্বিতীয়। সুদীপের বড় বোন একটি বেসরকারি সংস্থার উপব্যবস্থাপক পদে চাকরি করছেন।

২০০৭ সালে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সুদীপ। ২০১৫ সালে সেখান থেকে স্নাতক পাস করেন। সরকারি চাকরিতে যেহেতু প্রতিবন্ধী কোটা আছে এবং তারা বিসিএস ক্যাডারও হচ্ছেন ভেবে সহকারী জজের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে একজন শ্রুতিলেখকের জন্য অনুমতির জন্য গত ২৪ এপ্রিল বিজেএসসিতে গেলে তাকে বলা হয়, প্রতিবন্ধীদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই।

২০০৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রবেশ পদে নিয়োগবিষয়ক আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর কৃতকার্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হবে। সেখানে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যদি কাউকে শারীরিক বৈকল্য বলে প্রতিবেদন দেন, তবে তিনি নিয়োগের যোগ্য হবেন না।

তার বিষয়ে হাইকোর্টের আইনি লড়াইয়ের জন্য নিযুক্ত আইনজীবী কুমার দেবুল দে বলেন, ‘আবেদনকারী সুদীপ দাস এর আগেও জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএসসি) ১১ ও ১২তম পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৭ সালে শ্রুতিলেখকের জন্য আবেদন করে সাড়া না পাওয়ায় পরীক্ষায় অংশ নেননি। গত বছর আবেদন করে শ্রুতিলেখক না পেলেও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সাদা কাগজ জমা দিয়ে এসেছিলেন। এবারের পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক চেয়ে গত ৫ নভেম্বর জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত বিজেএসসি থেকে কিছু জানানো হয়নি।’

এ আইনজীবী বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’র ১৬ (ঝ) অনুযায়ী, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাকরির সমতা বিধান করেছে রাষ্ট্র। কিন্তু বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করেনি। এবারও তা বিবেচনা করা হবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। তাই এ রিট আবেদনটি করা হয়েছে।’

রিটটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে উপস্থাপন করা হলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার কার্যতালিকায় থাকতে পারে বলে জানান আইনজীবী।

সুদীপ চন্দ্র দাস বলেন, ‘বিসিএস, ব্যাংক, বার কাউন্সিল পরীক্ষায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শ্রুতিলেখক দেয়া হয়। কিন্তু বিজেএসসির পরীক্ষায় তা দেয়া হচ্ছে না। গত দুই বছর ধরে আমি চেয়ে আসছি, পাইনি। এটা বৈষম্যমূলক, অন্যায্য।’

তিনি কয়েকটি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘পাকিস্তানে একজন সিটিং জাজ দৃষ্টিহীন ব্যক্তি। ভারতের রাজস্থানের একজন বিচারকও দৃষ্টিশক্তিহীন। আমেরিকার মিশিগানেও একজন বিচারক আছেন। তবে সবার আগে নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকায় এ রকম একজন বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া আমাদের সর্বোচ্চ আদালতে যদি দৃষ্টিহীন আইনজীবী থাকতে পারেন, তাহলে জুডিশিয়ারিতে দৃষ্টিশক্তিহীন বিচারক কেন থাকতে পারবেন না?’

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’এর ১৬(ঝ) অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংরক্ষিত অধিকার সুরক্ষায় বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি, অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং অনুষ্ঠেয় ১৩তম জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা অথবা সব ধরনের পরীক্ষায় আবেদনকারীকে শ্রুতিলেখক দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয়েছে রিট আবেদনে।

রিটে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সম্পাদক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সুপ্রিম কার্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সমাজকল্যাণ সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিটে বলা হয়েছে, বিচারক নিয়োগের পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক নেয়ার আবেদন গ্রহণ না করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ ও ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আবেদনকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈষম্য করার সুযোগ নেই। কিন্তু দৃষ্টিশক্তিহীন আবেদনকারীর শ্রুতিলেখক দেয়ার আবেদন গ্রহণ না করে স্পষ্টত সংবিধানের এসব অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা বেআইনি এবং একই সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

একইভাবে সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন করা হয়েছে, যেখানে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’এর ১৬ (ঝ) অনুযায়ী, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চাকরির ক্ষেত্রে সমতা বিধান করেছে রাষ্ট্র। কিন্তু বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করেনি।

২০০৭ সালে সুদীপ দাস সীতাকুণ্ডের লতিফপুর আলহাজ আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০০৯ সালে উত্তর কাকতলী আলহাজ মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৪ সালে অনার্স করার পর ২০১৬ সালে মাস্টার্স করেন সুদীপ দাস।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
© All rights reserved © Matrijagat TV
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
matv2425802581