বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

ড. বিজন কুমার শীলের র‍্যাপিড টেস্টকিট উদ্ভাবন ও কিছু কথা! 📺 Matrijagat TV

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২০

গত ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হবার পর বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে আসছে। গত ১৪ ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস এদানম গেব্রেইয়েসুস বলেন “Our key message is: test, test, test”. কোভিড-১৯ সনাক্তকরণে সর্বজনবিদিত পরীক্ষা হলো RT-PCR। সারা বিশ্বে এ পরীক্ষা বিশ্বস্ততার সাথে করোনা ভাইরাস সনাক্তকরণে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু একইসাথে এ পরীক্ষার কিছু অসুবিধাও আছে। RT-PCR পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, এটি যথেষ্ট ব্যায়বহুল ও সময়সাপেক্ষ একটি পরীক্ষণ।

ক্রমাগত পরীক্ষণ ও সঙ্গনিরোধ কোভিড-১৯ রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান সূত্র হলেও অবকাঠামোগত স্বল্পতায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। করোনার নানা লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন যে সংখ্যক মানুষ পরীক্ষা করার জন্য আইইডিসিআর এ যোগাযোগ করছেন, তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক মানুষেরই এই পরীক্ষা করা হচ্ছে। করোনার উপসর্গ আছে এরকম অনেকেই অভিযোগ করছেন, টেস্ট করাতে চেয়েও আইইডিসিআরের সাড়া পাচ্ছেন না তারা। অনেককে আবার টেস্ট করানোর জন্য তদবির পর্যন্ত করতে হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জনসংখ্যা অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ায় টেস্ট করানোর হারে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। এ অপর্যাপ্ত সংখ্যক টেস্ট দুটা বড় সংকট তৈরি করেছে। প্রথমত, আক্রান্তদের একটা অংশ উপসর্গহীন; তারা নীরবে সংক্রমণ ঘটিয়ে চলছে। এর ফলে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ডাক্তার, নার্সসহ অনেক স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, ইমার্জেন্সি চিকিৎসা সেবা ব্যহত হচ্ছে এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। কিছু মানুষ যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত নয়, শ্বাসকষ্ট অথবা অন্যান্য শ্বসনতন্ত্রীয় সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য সেবীরা নিশ্চিত হতে পারছেন না যে সেসব রোগীরা COVID-19 এ আক্রান্ত কিনা। ফলে চিকিৎসার অভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও দেখা যাচ্ছে। এসব সংকট নিরসনে অতিসত্বর টেস্টের হার বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

এহেন পরিস্থিতিতে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে দ্রুত, সহজ ও সুলভ মূল্যে কোভিড-১৯ সনাক্তকরণের কিট উদ্ভাবন করেছে। গত ২৫ এপ্রিল শনিবার সকালে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের গেরিলা কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দার বীর বিক্রম মিলনায়তনে জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ প্রকল্পের আওতায় উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টেস্ট কিটের স্যাম্পল হস্তান্তর অনুষ্ঠান করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

এরই মাঝে এ টেস্ট কিট নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, প্রচার মাধ্যম, সামাজিক গনমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ সমালোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন তাদের দাবী এই টেস্ট কিছু “ফলস নেগেটিভ” এবং “ফলস পজিটিভ” রেজাল্ট দিতে পারে। এখানে সর্বসাধারণের উপলব্ধির জন্য এ দুটো পরিভাষা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। ফলস নেগেটিভ বলতে বুঝায়, কোন টেস্টের ফলাফল একজন আক্রান্ত মানুষকে অনাক্রান্ত নির্দেশ করা। অন্যদিকে ফলস পজিটিভ বলতে বুঝায় কোনো একজন সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত বলে নির্দেশ করা।

সমালোচকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আক্রান্ত মানুষকে স্বাধীনভাবে চলাচলের বৈধতা দিবে যার ফলশ্রুতিতে তারা নীরবে রোগ ছড়াবে। আবার ফলস পজিটিভ রেজাল্ট সুস্থ মানুষকেও বিপত্তির মধ্যে ফেলবে। সমালোচকদের এ অনুমান বাস্তবিক বলে ধরে নিলেও স্বল্পমূল্যের এ টেস্টকিট কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে RT-PCR টেস্ট করা হয় ৩ হাজার ৪ শত ৭৬ টি, যার মধ্যে পজিটিভ পাওয়া যায় ৪১৮ টি। অর্থাৎ টেস্ট করানো হয়েছে তার মধ্যে পজিটিভ কেইস মোটামুটি ১২%। কিন্তু এ সময়ে প্রতিদিন ১৫-২০ হাজার টেস্ট করা উচিৎ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করে। এখন টেস্টের পরিমাণ আরো ১০ হাজার বাড়ালে তার মধ্যে কতজন পজিটিভ পাওয়া যেতো? যদি তার মধ্যে ৫% পজিটিভ কেইসও ধরে নেয়া হয়, তাহলে পজিটিভ পাওয়া যেতো ৫০০ জন। সে মতে, প্রতিদিন আক্রান্ত পাওয়া যেতো প্রায় এক হাজার জন প্রায় (৪১৮+৫০০)। সুতরাং, ৫০০ জন আক্রান্ত টেস্টের বাহিরে থেকে রোগ ছড়িয়ে চলছে। এখন “জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট” টেস্টকিট ব্যবহার করে যদি এ ১৫ হাজার জনের (৩৪৭৬+১০০০০) টেস্ট করানো হয় এবং তাতে ১০% ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট থাকলে ১০০০ টি পজিটিভ কেইসের মধ্যে ১০০ জনকে আমরা সনাক্ত করা যাবে না। এই ১০০ জন মানুষ স্বাধীনভাবে চলে রোগ ছড়াতে পারে। কিন্তু তা কি ৫০০ জন রোগ ছড়ানোর চেয়ে ভাল নয়?

সমালোচকদের মতে, এ পরীক্ষণ কিছু ফলস পজিটিভ রেজাল্ট দিয়ে সুস্থ মানুষকে বিপত্তিতে ফেলতে পারে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ড. বিজন কুমার শীল পরিষ্কার করে বলেছেন, “এখানে ফলস পজিটিভ আসার কোন সুযোগ নেই। কারণ ভাইরাস রক্তে না থাকলে কোনভাবেই পজিটিভ আসবে না।” তবুও যদি ধরে নিই, কিছু ফলস পজিটিভ রেজাল্ট আসবে, তবে সে সমস্যা উত্তরণের পথও রয়েছে। তা হলো, “জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট” টেস্টে যাদের পজিটিভ রেজাল্ট আসবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের RT-PCR করে দেখা। এ ক্ষেত্রে মাত্র ১০০০ টি পজিটিভ কেইস RT-PCR করে দেখা কঠিনসাধ্য হবে না। অধিকন্তু, ১ হাজারটি RT-PCR ও ১৫ হাজার ডট ব্লট টেস্টের একত্রে খরচ, সাড়ে তিন হাজার RT-PCR করা থেকে অনেক সুলভ হবে; অন্যদিকে টেস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে।

মোঃ রইস উদ্দিন,
মাস্টার্স স্টুডেন্ট, প্যাথলজি বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
টিভি চ্যানেল
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
matv2425802581