সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন

ইয়াবার ছোঁয়ায় বেকার যুবক থেকে অটল  সম্পদের মালিক টেকনাফের শফিক

স্টাফ রিপোর্টাস
  • আপডেট টাইম মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইয়াবার ছোঁয়ায় বেকার যুবক থেকে অটল  সম্পদের মালিক টেকনাফের শফিক

আলাদিনের চেরাগ! ঘষা দিলেই বেরিয়ে আসে বিশাল এক দৈত্য। বেরিয়েই বলে, ‘হুকুম করুন মালিক’। চেরাগের মালিক দৈত্যকে তার পৌছন্দের জিনিসের কথা বলে। মুহূর্তে সেই দৈত্য মালিকের পছন্দের জিনিস সামনে হাজির করে দেয়। রূপকথার এ গল্পটি মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু রূপকথার এ গল্পকে বাস্তব রূপ দিয়েছে টেকনাফের কিছু মানুষ। বাস্তবে রূপ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেরাগের নাম বদলে হয়েছে ‘ইয়াবা চেরাগ’। আর এ ইয়াবা চেরাগের ছোঁয়ায় রাস্তার কুলি, থেকে এখন রাজা-বাদশাহ। একটা সময় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যেন আলাদিনের চেরাগের সেই দৈত্যকেও হার মানিয়ে দেয় ‘ইয়াবা চেরাগ’। অল্প দিনেই টেকনাফের ফকির, হকার, ভবভবঘূরে যুবক, ঠেলাচালক, দোকান কর্মচারী ফুলে ফেঁপে কলাগাছে পরিণত হতে থাকে।
কক্সবাজারের টেকনাফে সরেজমিন জানা গেছে- ইয়াবা কারবারিদের অঢল সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়ার নানা গল্প। টেকনাফেই রয়েছে শতাধিক অট্টালিকা; যার সবই ইয়াবা কারবারিতে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০২ কারবারির আত্মসমর্পণের পর পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা তাদের সম্পদের খোঁজ নিতে গিয়ে হতবাক। তারা বলছেন, এয়ো কি সম্ভব! কক্সবাজারের টেকনাফে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফে কেউ অর্থ লগ্নি করেছেন, আবার কেউ অর্থ লগ্নি ছাড়াই কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এমনি একজন গডফাদার ইয়াবা ব্যবসা করে অল্প সময়েই অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লানপাড়া এলাকার মোঃ শফিক নামে এক যুবক। অথচ তার চালচলন এখনও একজন মধ্যবিত্তের মতো।
সবসময় মধ্যবিত্তের মতো লুঙ্গি আর শার্ট, প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে চলাফেরা করেন। কিন্তু তিনি এলাকার জনশ্রুত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম।
জানা গেছে, টেকনাফ শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষের জীবনযাপন আলাদা। তাদের কোনও অভাব-অনটন নেই। তাদের অধিকাংশের রয়েছে অত্যাধুনিক ঘরবাড়ি। প্রতিটি বাড়ি তৈরি করতে খরচ হয়েছে কমপক্ষে কোটি টাকার মতো। অথচ, এক সময় তাদের কারও কারও একবেলা খাবারও জুটতো না। ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক ব্যবসা করে তারা আজ অঢেল সম্পদের মালিক।
১৫ বছর আগেও এই শফিকের পরিবারের সদস্যরা একবেলা খেতে পারতেন না। আর এখন তারা কয়েক কোটি টাকার মালিক। ১০ বছরের আগে স্থলবন্দরে তার অপরাপর ভাইয়েরাসহ কুলির কাজ করতেন মো.শফিক, সেই কুলির পাশাপাশি ২০১০ সালের দিকে তার ভাই জাহাঙ্গীরসহ ইয়াবা ব্যবসায় নাম লেখান তিনি এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসার জোয়ারে তালমিলিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তার মতো টেকনাফের বেশিরভাগ ইয়াবা ব্যবসায়ীর রয়েছে অঢেল সম্পত্তি। ইয়াবার বিরুদ্ধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করলেও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জৌলুশে কোনও কমতি নেই।
সূত্রের দাবি, সে মাদক ব্যবসা করে গাড়ি-বাড়ি-ফ্ল্যাট ও জমিসহ ৫০ লাখ টাকার মুরগির ফার্ম, জমা রয়েছে ব্যাংক-বীমাতে অর্থ, ৩০ লাখ টাকা হাসপাতালের শেয়ার হোল্ডার কিনেছেন। তার এলাকায় নিজস্ব জমিতে মুরগির র্ফাম রয়েছে, তার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকার মতো। নামে- বেনামে তিনি এসব সম্পত্তি করেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগ রয়েছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারের অন্যতম গডফাদার বার্মাইয়া ছৈয়দ আলমের মাধ্যমে ইয়াবা আনতেন শফিক। তা মাটিতে পুঁেত রেখে সারাদেশে সরবরাহ করতেন। সম্প্রতি ছৈয়দ আলম বিজিবির সাথে বন্দুকযুদে¦ নিহত হবার পর থেকে মিয়ানমার থেকে পাঠানো ব্যবসায়ীর সাথে সে নিয়মিত ব্যবসা চালিয়ে আসছে। সেই ছৈয়দ আলমের ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রক এখন শফিক ও জাহাঙ্গীরের হাতে।
তার মুরগির র্ফাম ও বাড়ির আতেপাশে গেলে এখনো তার ফেলে দেয়া নস্ট ইয়াবা পাওয়া যায় বলে জানান এলাকাবাসীরা।
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাাদক নুরুল বশর বলেন-‘মাদক পাচার করে অল্প সময়ে প্রচুর বিত্তবৈভব হচ্ছে অনেকের। লোভে পড়েই পরিবারের স্বজনরা মিলেমিশে জড়িয়ে পড়ছে এ ব্যবসায়। বন্দুকযুদ্ধে স্বজন হারানোর পরও কেউ সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করতে পারছে না। স্বজন হারানোর পরও মনোযোগ ওদের সম্পদে। আবার বাবা-ছেলের পবিত্র সম্পর্ককেও কলুষিত করে মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে কেউ কেউ।বদলি হওয়া
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেছিলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের অবৈধ সম্পদের তালিকা করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে যে, বেশিরভাগ ইয়াবা ব্যবসায়ী অঢেল সম্পদের মালিক। তাদের সম্পদের খোঁজ নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি একটু ভাল হলে দুদক ও এনবিআর এ ব্যাপারে জোরালো অভিযান চালাবে।’
এদিকে কক্সবাজার-টেকনাফের তালিকাভুক্ত ১১৭ মাদক কারবারির অঢেল সহায়-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ এ ধরনের একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। মাদক কারবারিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা পুলিশ পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। যাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । এদের মধ্যে ৫০ ‘মাদক ডনের’ সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। একেক জনের ১০০ কোটি থেকে শুরু করে ১ হাজার কোটি টাকারও সম্পদ আছে বলে পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে। পুলিশের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এ নিয়ে কাজ করছে। কারবারিদের সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
টিভি চ্যানেল
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
matv2425802581